Google Analytics এক্সটেনসিভ গাইড: নতুনদের জন্য সম্পূর্ণ টিউটোরিয়াল

Google Analytics (GA) কী? সহজ কথায়, Google Analytics হলো একটি ফ্রি ওয়েব অ্যানালিটিক্স টুল, যা Google প্রদান করে। এটি আপনার ওয়েবসাইট বা অ্যাপের ভিজিটরদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেই তথ্যকে সহজে বোঝার মতো রিপোর্ট আকারে উপস্থাপন করে। এটিকে আপনার ওয়েবসাইটের “রিপোর্ট কার্ড” বলতে পারেন।

কেন এটি প্রয়োজন? আপনি যদি একটি ওয়েবসাইট চালান, তবে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে:

  • কতজন মানুষ আপনার সাইটে আসছে?
  • তারা কোথা থেকে আসছে (ফেসবুক, গুগল সার্চ, ইউটিউব, নাকি সরাসরি)?
  • তারা আপনার সাইটে কতক্ষণ সময় কাটাচ্ছে?
  • তারা কোন কোন পেজগুলো বেশি দেখছে?
  • তারা মোবাইল দিয়ে দেখছে নাকি কম্পিউটার দিয়ে?
  • কোন কোন পেজ থেকে তারা সাইট ছেড়ে চলে যাচ্ছে?

Google Analytics এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়, যা আপনাকে আপনার ওয়েবসাইট, ব্লগ বা অনলাইন ব্যবসা আরও ভালোভাবে চালাতে সাহায্য করে।

🛠️ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র

Google Analytics শুরু করার জন্য আপনার দুটি জিনিস লাগবে:

  1. 📨 একটি Google অ্যাকাউন্ট: (যেমন Gmail অ্যাকাউন্ট)। যদি না থাকে, তবে ফ্রিতে একটি খুলে নিন।
  2. 💻 একটি ওয়েবসাইট: যার একটি ডোমেইন নাম আছে (যেমন www.yourwebsite.com) এবং যার ব্যাকএন্ডে আপনি কোড পরিবর্তন করার অ্যাক্সেস পাবেন।

🧭 ধাপে ধাপে Google Analytics সেটআপ করার নিয়ম

চলুন, এবার সেটআপ প্রক্রিয়া শুরু করা যাক।

🚀 Google Analytics-এ সাইন আপ করুন

  1. Google Analytics-এর ওয়েবসাইটে যান।
  2. আপনার Google অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগ ইন করুন।
  3. “Start measuring” বাটনে ক্লিক করুন।

🧾 অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন

  1. Account Name: আপনার অ্যাকাউন্টের একটি নাম দিন। এটি আপনার ব্যবসা বা ওয়েবসাইটের নাম হতে পারে। যেমন, “My Business Account”।
  2. নিচের দিকে আপনি কিছু ডেটা শেয়ারিং সেটিংস দেখতে পাবেন। ডিফল্ট সেটিংসই সাধারণত ভালো থাকে।
  3. “Next” ক্লিক করুন।

🏗️ প্রপার্টি (Property) তৈরি করুন

  1. Property Name: এখানে আপনার ওয়েবসাইটের নাম বা URL দিন। যেমন, “www.yourwebsite.com"। একটি অ্যাকাউন্টের অধীনে আপনি একাধিক ওয়েবসাইটের জন্য আলাদা আলাদা প্রপার্টি তৈরি করতে পারেন।
  2. Reporting Time Zone: আপনার সময় অঞ্চল নির্বাচন করুন। ভারতের জন্য “India” সিলেক্ট করুন।
  3. Currency: আপনার ব্যবসার মুদ্রা নির্বাচন করুন (যেমন, Indian Rupee – INR)।
  4. “Next” ক্লিক করুন।

🏢 বিজনেস ইনফরমেশন দিন

  1. Industry Category: আপনার ব্যবসা বা ওয়েবসাইটের ক্যাটাগরি নির্বাচন করুন।
  2. Business Size: আপনার ব্যবসার আকার নির্বাচন করুন।
  3. “Next” ক্লিক করুন এবং তারপর “Create” ক্লিক করে প্রপার্টি তৈরি শেষ করুন।

🧩 ডেটা স্ট্রিম (Data Stream) তৈরি করুন এবং ট্র্যাকিং কোড সংগ্রহ করুন এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখান থেকেই আপনি সেই কোডটি পাবেন, যা আপনাকে আপনার ওয়েবসাইটে বসাতে হবে।

  1. Choose a platform: আপনি “Web” নির্বাচন করুন।
  2. Set up your web stream:
    • Website URL: আপনার ওয়েবসাইটের পুরো URL লিখুন (যেমন, https://www.yourwebsite.com)।
    • Stream name: একটি নাম দিন, যেমন “Website Stream”।
    • “Enhanced measurement” নামে একটি অপশন দেখতে পাবেন। এটি অন রাখুন। এটি পেজ ভিউ, স্ক্রল, আউটবাউন্ড ক্লিক ইত্যাদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাক করে।
  3. “Create stream” ক্লিক করুন।

< > ট্র্যাকিং কোড ওয়েবসাইটে ইনস্টল করুন স্ট্রিম তৈরি হয়ে গেলে আপনি একটি নতুন পেজ দেখতে পাবেন। এখানে “Tagging instructions” নামে একটি সেকশন আছে।

  1. আপনি একটি “Measurement ID” দেখতে পাবেন, যা দেখতে এমন হবে: G-XXXXXXXXXX। এটিই আপনার ট্র্যাকিং আইডি।
  2. এই আইডি এবং একটি ছোট জাভাস্ক্রিপ্ট কোড (Global Site Tag – gtag.js) আপনাকে আপনার ওয়েবসাইটের প্রতিটি পেজের <head> সেকশনে বসাতে হবে।

কীভাবে কোডটি বসাবেন? এটি আপনার ওয়েবসাইট কীভাবে তৈরি করা হয়েছে তার উপর নির্ভর করে।

  • যদি আপনি WordPress ব্যবহার করেন (সবচেয়ে সহজ উপায়):
    • আপনার WordPress ড্যাশবোর্ডে যান।
    • “Plugins” > “Add New” এ ক্লিক করুন।
    • “Site Kit by Google” সার্চ করে ইনস্টল এবং অ্যাক্টিভেট করুন।
    • এই প্লাগইনটি আপনাকে আপনার Google অ্যাকাউন্টের সাথে কানেক্ট করতে বলবে। কয়েকটি ধাপে আপনি আপনার Google Analytics অ্যাকাউন্ট কানেক্ট করে দিন। প্লাগইনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোড বসিয়ে দেবে। আপনার কোডিং জানার দরকার নেই।
  • যদি আপনি ম্যানুয়ালি কোড বসাতে চান:
    • আপনার ওয়েবসাইটের ফাইল ম্যানেজারে লগ ইন করুন (যেমন cPanel, FTP)।
    • আপনার ওয়েবসাইটের থিম বা টেমপ্লেটের header.php ফাইলটি খুঁজুন।
    • ফাইলটি এডিট করে <head> ট্যাগটি খুঁজুন এবং তার ঠিক পরেই Google Analytics-এর দেওয়া কোডটি পেস্ট করে সেভ করুন।

কোড সফলভাবে ইনস্টল হওয়ার পর, ডেটা আসতে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তবে Realtime রিপোর্টে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিজিটর দেখতে পারেন।

📊 Google Analytics ড্যাশবোর্ড বোঝা

আপনার ড্যাশবোর্ডে লগ ইন করলে আপনি কয়েকটি প্রধান অংশ দেখতে পাবেন:

  • 🏠 হোম (Home): এটি আপনার ওয়েবসাইটের একটি সামগ্রিক চিত্র দেয়। এখানে আপনি দেখতে পাবেন গত ২৮ মিনিটে কতজন ইউজার এসেছে, সবচেয়ে বেশি দেখা পেজ, সবচেয়ে বেশি ট্রাফিকের উৎস ইত্যাদি।
  • 📈 রিপোর্ট (Reports): এটি মূল অংশ। এখানে আপনি সব ধরনের ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারবেন। বাম দিকে একটি মেনু আছে।
  • 🧭 এক্সপ্লোর (Explore): এখানে আপনি কাস্টম রিপোর্ট তৈরি করতে পারেন এবং ডেটার মধ্যে নিজের মতো করে খুঁজে বেড়াতে পারেন। এটি একটু এডভান্সড লেভেলের।
  • 📢 বিজ্ঞাপন (Advertising): আপনি যদি Google Ads ব্যবহার করেন, তবে এই সেকশনটি আপনার জন্য।

📊 গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট এবং সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করবেন

রিপোর্ট সেকশনের মেনুটি কয়েকটি ভাগে ভাগ করা আছে। নতুনদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রিপোর্ট হলো:

🧭 অর্জন রিপোর্ট (Acquisition Reports)

এই রিপোর্ট আপনাকে বলে দেয় যে আপনার ভিজিটররা কোথা থেকে আসছে

  • Reports > Acquisition > Traffic acquisition: এখানে আপনি দেখতে পাবেন বিভিন্ন উৎস থেকে কতজন ইউজার এসেছে।
    • Organic Search: গুগল, বিং ইত্যাদি সার্চ ইঞ্জিন থেকে আসা ভিজিটর।
    • Direct: কেউ সরাসরি ব্রাউজারে আপনার ওয়েবসাইটের ঠিকানা লিখে প্রবেশ করলে।
    • Referral: অন্য কোনো ওয়েবসাইটে আপনার সাইটের লিঙ্ক দেওয়া আছে, সেখান থেকে ক্লিক করে আসা ভিজিটর।
    • Social: ফেসবুক, টুইটার, লিংকডইন ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে আসা ভিজিটর।
    • Paid Search: গুগল বা অন্য কোনো সার্চ ইঞ্জিনে বিজ্ঞাপন দিয়ে আনা ভিজিটর।

🕒 সম্পৃক্ততা রিপোর্ট (Engagement Reports)

এই রিপোর্ট আপনাকে বলে দেয় যে ভিজিটররা আপনার সাইটে এসে কী করছে

  • Reports > Engagement > Events: GA4-এ সবকিছুই “ইভেন্ট” হিসেবে গণনা করা হয়। যেমন:
    • page_view: কোনো পেজ দেখা হলে।
    • scroll: কোনো পেজের ৯০% পর্যন্ত স্ক্রল করলে।
    • click: কোনো লিঙ্কে ক্লিক করলে।
  • Reports > Engagement > Pages and screens: এখানে আপনি দেখতে পারবেন আপনার ওয়েবসাইটের কোন পেজগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা হয়েছে, কোন পেজগুলোতে মানুষ বেশি সময় কাটিয়েছে। এটি আপনাকে বুঝতে সাহায্য করে কোন কন্টেন্ট জনপ্রিয়।
  • Reports > Engagement > Conversions: এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কনভার্সন হলো সেই ইভেন্ট যা আপনার ব্যবসার জন্য মূল্যবান। যেমন:
    • কেউ আপনার “Contact Us” ফর্মটি সাবমিট করলে।
    • কেউ কোনো প্রোডাক্ট কিনলে।
    • কেউ আপনার নিউজলেটারে সাইন আপ করলে। আপনাকে নিজে থেকে Google Analytics-কে বলে দিতে হবে কোন ইভেন্টটি কনভার্সন হিসেবে গণনা করতে হবে।

🧑‍🤝‍🧑 জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রিপোর্ট (Demographics Reports)

এই রিপোর্ট আপনাকে বলে দেয় আপনার ভিজিটররা কারা

  • Reports > Demographics > Overview: এখানে আপনি দেখতে পারবেন আপনার ভিজিটরদের বয়স, লিঙ্গ, দেশ, শহর ইত্যাদির বিবরণ। এটি আপনাকে আপনার টার্গেট অডিয়েন্সকে আরও ভালোভাবে বোঝতে সাহায্য করে।

💻 প্রযুক্তিগত রিপোর্ট (Tech Reports)

এই রিপোর্ট আপনাকে বলে দেয় ভিজিটররা কীভাবে আপনার সাইটে প্রবেশ করছে।

  • Reports > Tech > Tech details: এখানে আপনি দেখতে পাবেন ভিজিটররা কোন ব্রাউজার (Chrome, Firefox), ডিভাইস (Desktop, Mobile, Tablet) এবং অপারেটিং সিস্টেম (Windows, Android, iOS) ব্যবহার করছে। যদি দেখেন বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল থেকে আসছে, তবে আপনার ওয়েবসাইটকে মোবাইল-ফ্রেন্ডলি করা অত্যন্ত জরুরি।

📊 ব্যবহারিক উদাহরণ: ডেটা থেকে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিবেন

ডেটা শুধু দেখলেই হবে না, সেই ডেটা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

🔥 আপনি দেখলেন “Pages and screens” রিপোর্টে “১০টি সেরা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট টুলস” শিরোনামের একটি ব্লগ পোস্ট সবচেয়ে বেশি দেখা হয়েছে এবং সেখানে গড়ে ৫ মিনিট সময় কাটাচ্ছে।

  • সিদ্ধান্ত: মানুষের ওয়েব ডেভেলপমেন্ট টুলস বিষয়ে আগ্রহ আছে। আপনি এই বিষয়ে আরও কয়েকটি ব্লগ লিখতে পারেন বা একটি ইউটিউব ভিডিও বানাতে পারেন।

🌐 “Acquisition” রিপোর্টে দেখলেন আপনার ওয়েবসাইটের ৬০% ট্রাফিক আসছে ফেসবুক থেকে।

  • সিদ্ধান্ত: ফেসবুক আপনার জন্য খুবই কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম। আপনার ফেসবুক পেজে আরও সময় দেওয়া, নিয়মিত পোস্ট করা এবং ফেসবুক গ্রুপে সক্রিয় থাকা উচিত।

💻 “Tech” রিপোর্টে দেখলেন ৮০% ভিজিটর মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করছে, কিন্তু “Engagement” রিপোর্টে দেখলেন মোবাইল ইউজারদের গড় সময় ডেস্কটপ ইউজারদের তুলনায় অনেক কম।

  • সিদ্ধান্ত: আপনার ওয়েবসাইটের মোবাইল ভার্সনে কোনো সমস্যা আছে। হয়তো সাইট ধীরে লোড হচ্ছে বা নেভিগেশন জটিল। আপনাকে অবিলম্বে আপনার ওয়েবসাইটের মোবাইল অভিজ্ঞতা উন্নত করা উচিত।

নতুনদের জন্য কিছু প্রো-টিপস

🔗 Google Search Console কানেক্ট করুন: Google Analytics-এর সাথে Google Search Console কানেক্ট করলে আপনি আপনার ওয়েবসাইটের গুগল সার্চ পারফরম্যান্স (কোন কীওয়ার্ডে কতজন ভিজিটর এসেছে) দেখতে পারবেন। এটি SEO-এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়মিত চেক করুন: সপ্তাহে অন্তত একবার Analytics চেক করার অভ্যাস করুন। এতে আপনি আপনার ওয়েবসাইটের পারফরম্যান্সের ট্রেন্ড বুঝতে পারবেন।

🧠 ডেটাতে ডুবে যাবেন না: শুরুতে অনেক ডেটা দেখে ঘাবড়ে যাবেন না। শুধু উপরে উল্লেখিত মূল রিপোর্টগুলোর দিকে মনোযোগ দিন।

🎯 কনভার্সন সেট আপ করুন: আপনার ওয়েবসাইটের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকশনটি (যেমন ফর্ম সাবমিশন) কনভার্সন হিসেবে মার্ক করুন। এটি আপনাকে আপনার ব্যবসার সাফল্য মাপতে সাহায্য করবে।

Google Analytics শেখা একদিনের ব্যাপার নয়। ধীরে ধীরে অনুশীলন করতে থাকুন এবং ডেটা অনুযায়ী আপনার কৌশল পরিবর্তন করুন। শুভকামনা

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।